শনিবার, ৩০শে আগস্ট, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ, ১৫ই ভাদ্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, রাত ৪:২৫

গণপূর্তের কুদরত-ই-খুদার সীমাহীন দূর্নীতির কুদরতি খেলা

0Shares

আওয়ামী লেবাস গায়েব ॥ একই গদিতে ১২ বছর থাকার তেলেসমাতি

বেঞ্জামিন রফিক: গণপূর্তের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ কুদরত-ই খুদার বিরুদ্ধে সীমাহীন দূর্নীতি এবং নানান কায়দা কৌশল অবলম্বন করে একই পদে টানা ১২ বছরের অধিক সময়ে থাকার গুরুতরো অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সূত্রমতে, উপ-বিভাগীয় অফিসার থেকে অদৃশ্য এক ভানুমতির খেলায় জ্যৈষ্ঠ এক কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচারের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ হিসেবে যোগদান করেন। অত:পর ঘোড়া ডিঙায়ে ঘাস খাওয়ার মতন ক্ষমতার জোরে নিয়ম-নীতির (চাকুরি) ব্যত্যয় ঘটিয়ে টানা এক যুগেরও বেশি সময় বিভাগটির প্রধানকর্তার পদটি নিজ করায়ত্বে রেখেছেন।
অন্যদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জ্যৈষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে এগিয়েছিলেন আরেক উপ-বিভাগীয় অফিসার মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। এক্ষেত্রে তিনি হয়েছেন বৈষম্যের শিকার। এক শাখা থেকে অন্য শাখায় বদলি করে তাকে মানসিক হয়রানি করা হয়। তবে শেখ মো. কুদরত-ই-খুদা আওয়ামী লীগের লেবাসধারী হওয়ায় জুনিয়র হয়েও প্রধান বৃক্ষপালনবিদের পদটি বাগিয়ে নেন।
উল্লেখ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দায়িত্বে আসেন শেখ মো. কুদরত-ই-খুদা। তিনি আওয়ামী লীগপন্থী কর্মকর্তা হওয়ায় কর্মস্থলে ক্ষমতার দাপট দেখাতে থাকেন। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নানান দূর্নীতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। কর্মীদের পোশাক, বাগান পরিষ্কারের নামে এবং খাতায় ভুয়া কর্মচারী দেখিয়েও ভুয়া বিলে-ভাউচারে তুলে নেন টাকা। এ ছাড়া ঠিকাদারের সঙ্গে আঁতাত করে চারা রোপণ, সীমানাপ্রাচীর তৈরি, হেজবেড ও ফুলের বেড প্রস্তুতের বরাদ্দ গায়েব করে দেন বলে সূত্র জানায়। এতো অনিয়ম ও দুর্নীতি করেও স্ব-পদে বহাল তবিয়তে আছেন কুদরত-ই-খুদা।
জানতে চাইলে আরবরিকালচার-এর ভূক্তভোগী এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের শাখায় (আরবরিকালচার) বছরে ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। এ বরাদ্দের বড় একটি অংশ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে লুটপাট করছেন প্রধান বৃক্ষপালনবিদ কুদরত। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত টাকা-পয়সা খরচ করে ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। তার দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় অন্যদের নানাভাবে হয়রানি করছেন।
খবর নিয়ে জানা গেছে, আরবরিকালচারের ওই দুর্নীতিবাজ প্রধান কর্মকর্তা আর অফিস করতে কার্যালয়ে আসছেন না। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তিনি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এর ফলে কার্যালয়টির সব কাজ স্থবির হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কয়েকজন কর্মচারী জানান, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই তিনি (কুদরত) পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর অফিসে আসেন না। বিভিন্ন কাজের লোকজন এসে ঘুরে যাচ্ছেন। তার পরিবর্তে অন্য কোনো কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এরফলে অফিসটির সব কাজ স্থবির হয়ে গেছে।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গণপূর্তের বৃক্ষপালন শাখার ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে তদন্তকাজ শুরু করে। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত-২ গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর এ চিঠি ইস্যু করা হয়। ওই সময় দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা গণপূর্তের বৃক্ষপালন শাখার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা দুদকের কাছে প্রধান বৃক্ষপালনবিদের দুর্নীতির বিষয়ে তথ্য দেন। পরে দুদক একজন কর্মকর্তা ও দুজন কর্মচারীকে চিঠি দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। এরপর দুদক গণপূর্তের ওই শাখার বেশ কিছু ফাইল তলব করে। কিন্তু কুদরত-ই-খুদা দুদককে সেই সব ফাইল জমা দেননি। পরে দুদক গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে ওই সব অভিযোগের তদন্ত করে দেখার সুপারিশ করে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ভিত্তিতে গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির কাছেও ওই সব ফাইলের তথ্য দেয়া হয়নি।
অপরদিকে, ২০১৬ সালে কুদরত-ই-খুদার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তকাজ চলমান সময় তার দুর্নীতির বিষয়ে মুখ খোলেন মো. মোয়াজ্জেম হোসেন নামের কর্মকর্তা ও কয়েক জন কর্মচারী। তবে, এ ঘটনায় কুদরত-ই-খুদা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দুর্নীতির প্রতিবাদকারী একজনকে চাকরিচ্যুত করেন। আর বাকিদের শাস্তিমূলক বদলি করেন। মোটা অঙ্কেও টাকা বিনিময় করে ৭ বছর ধরে চেপে রেখেছেন সেই দুর্নীতির তদন্ত।
জানা গেছে, প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই-খুদাকে ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি ওই সব কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। দুদকের চাহিদার বিষয়ের মধ্যে ছিল ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভুয়া পোশাক ভাতা বিলের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা উত্তোলন, কাজ না করে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতা খাতের ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৯ টাকা আত্মসাৎ, সীমানাপ্রাচীর ও বহিঃবিভাগে হেজবেড এবং ফুলের বেড প্রস্তুত, চারা রোপণসহ বিভিন্ন খাতের ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭২ টাকার কাজ না করে বিল উত্তোলন, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাস কর্তন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নার্সারির উন্নয়ন কার্যক্রম এবং শিখা চিরন্তন এলাকায় ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের হিসাব, বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবন, ২ নম্বর ভবন, ৩ নম্বর ভবন, ৪ নম্বর ভবন, ৮ নম্বর ভবন, ৯ নম্বর ভবনসংলগ্ন মাঠে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মৌসুমি ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের তথ্য-উপাত্ত, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আরবরিকালচার (বৃক্ষপালন শাখার) কর্মীদের পোশাকের নথি এবং বাংলাদেশ সচিবালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর দিকের সীমানা প্রাচীরের বহিঃবিভাগ হেজবেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ এবং শাখাতে চারা কলম উৎপাদনের হিসাব, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রাঙ্গণে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মৌসুমের ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ এবং পূর্ত ভবন প্রাঙ্গণের ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ ও শোভাবর্ধন গাছ সরবরাহকরণ এবং ইস্কাটন গার্ডেনে উচ্চপদস্থ সরকারি বাড়ির আঙিনায় শীতকালীন মৌসুমি ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের খরচের হিসাব।
এ প্রসঙ্গে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতার বলেন, আমার জানা মতে বেশকিছু দুর্নীতির অভিযোগ ছিল প্রধান বৃক্ষপালনবিদের বিরুদ্ধে। তবে, সে-সবের সর্বশেষ কী অবস্থা, সেটি আমি যাচাই-বাছাই করে দেখব। দুর্নীতির ঘটনার পরো যদি তদন্তকাজে কোনো বিচ্যুতি থেকে থাকে, তাহলে-তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই খুদাকে ২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি ওই সব কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। দুদকের চাহিদার বিষয়ের মধ্যে ছিল ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ভুয়া পোশাক ভাতা বিলের মাধ্যমে ৫ লাখ টাকা উত্তোলন, কাজ না করে পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্নতা খাতের ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯৯ টাকা আত্মসাৎ, সীমানাপ্রাচীর ও বহিঃবিভাগে হেজবেড এবং ফুলের বেড প্রস্তুত, চারা রোপণসহ বিভিন্ন খাতের ১৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭২ টাকার কাজ না করে বিল উত্তোলন, ২০১৩-১৪ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘাস কর্তন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নার্সারির উন্নয়ন কার্যক্রম এবং শিখা চিরন্তন এলাকায় ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের হিসাব, বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবন, ২ নম্বর ভবন, ৩ নম্বর ভবন, ৪ নম্বর ভবন, ৮ নম্বর ভবন, ৯ নম্বর ভবনসংলগ্ন মাঠে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মৌসুমি ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের তথ্য-উপাত্ত, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের আরবরিকালচার (বৃক্ষপালন শাখার) কর্মীদের পোশাকের নথি এবং বাংলাদেশ সচিবালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর দিকের সীমানা প্রাচীরের বহিঃবিভাগ হেজবেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ এবং শাখাতে চারা কলম উৎপাদনের হিসাব, ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন প্রাঙ্গণে গ্রীষ্ম ও শীতকালীন মৌসুমের ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ এবং পূর্ত ভবন প্রাঙ্গণের ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণ ও শোভাবর্ধন গাছ সরবরাহকরণ এবং ইস্কাটন গার্ডেনে উচ্চপদস্থ সরকারি বাড়ির আঙিনায় শীতকালীন মৌসুমি ফুলের বেড প্রস্তুত ও চারা রোপণের খরচের হিসাব।
জানা গেছে,দুদকের কাছে প্রধান বৃক্ষপালনবিদের বিষয়ে দুর্নীতির তথ্য দেওয়ায় নানা হয়রানির শিকার হয়েছেন গণপূর্ত উপবিভাগ-১-এর আরবরিকালচারের মেকানিক মো. সোলেমান। ২০১৬ সালের ৩ মে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সাক্ষ্য দিয়েছেন। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ। কিছুদিন পর তাকে ঢাকা থেকে চাঁদপুরে বদলি করা হয়। তার পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় বসবাস করায় ২০১৯ সালের আগস্টে বদলি হয়ে ঢাকায় আসেন। আগের আক্রোশে ২০২২ সালের মার্চে পুনরায় তাকে সাতক্ষীরায় বদলির আদেশ করেন। এ ঘটনার প্রতিকার পেতে শ্রম আদালতে মামলা করেন মেকানিক সোলেমান। এরপর আদালত থেকে নোটিস ইস্যু হলে প্রধান প্রকৌশলীর হস্তক্ষেপে তার বদলির আদেশ স্থগিত করা হয়েছে।
সূত্রমতে,গণপূর্তের বৃক্ষপালন বিভাগে মালি হিসেবে কর্মরত ছিলেন মো. নয়ন মোল্লা। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনের কর্মী হিসেবে অবসরে গেছেন। প্রধান বৃক্ষপালনবিদের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে দুদকে সাক্ষ্য দিয়েছেন।
২০১৬ সালে গণপূর্তের বৃক্ষপালন শাখার রমনা এলাকার পাওয়ার লন মেশিন অপারেটরের দায়িত্বে ছিলেন মিজানুর রহমান। প্রধান বৃক্ষপালনবিদের দুর্নীতির তথ্য দুদকের প্রতিনিধির কাছে বলে দেওয়ায় তাকে গোপালগঞ্জে বদলি করেন। চলতি বছরের জুন মাসে ঢাকায় বদলি হয়েছেন। ঢাকায় পরিবার-পরিজন রেখে সাত বছর গোপালগঞ্জে কেটেছে তার।
গণপূর্তের বৃক্ষপালন শাখার উপবিভাগীয় বৃক্ষপালনবিদ মো. মোয়াজ্জেম হোসেন। বর্তমান চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৬ সালে দুদক অনুসন্ধানে নেমে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধান বৃক্ষপালনবিদ তার অসাধু সিন্ডিকেট ব্যবহার করে এই কর্মকর্তাকে রাজশাহীতে বদলি করেন।
প্রশ্ন উঠেছে গণপূর্তের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ কুদরত-ই খুদা কি আইনের উর্দ্ধে? একের পর এক দূর্নীতি করে যাওয়ার পরও টানা ১২ বছর যাবত একই পদে সমাসীন থাকার রহস্য কি? ৫ আগষ্ট ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর পালিয়ে বেড়ানো গণপূর্তের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ কুদরত-ই খুদা অফিসে স্তবিরতা সৃষ্টি করার দু:সাহস পেলেন কোথায়?
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্যে নিতে আরবরিকালচারের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই-খুদার মোবাইলে দুটি ব্যবহৃত নম্বরে একাধিকবার সংযোগ করা হলেও, সংযোগ মেলেনি।
সংশ্লিষ্ট ওয়াকিবহাল মহলের মতে অবিলম্বে মহা দূর্নীতিবাজ কুদরত-ই খুদার সামগ্রিক বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি সহ তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমাদেয়া সময়ের দাবী।

 

0Shares

শেয়ার করুন